দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় করো'নার প্রভাব

বাংলাদেশে করো'না পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় চলতি বছর আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে না। আগামী ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুল-কলেজের ছুটি বাড়ানো হয়েছে, যদিও টেলিভিশনে ক্লাস প্রচারিত হয়েছে।

বুধবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এক ভা'র্চুয়াল প্রেস কনফারেন্সে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেছেন, স্কুল কবে খুলবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করবে করো'নাভাই'রাস পরিস্থিতির ওপর। ন্ত্রী আভাস দিয়েছেন, শীতের সময় করো'নাভাই'রাসের সংক্রমণ বেশি থাকে আর আমাদের দেশে মা'র্চ মাস পর্যন্ত শীত থাকে। শীতের প্রকোপ কমা'র পর স্কুল খোলা হতে পারে। মন্ত্রী বলেছেন, যখনি স্কুল খোলা সম্ভব হবে, তখনি আম'রা খুলে দেব। তবে স্কুল খুললেও পুরোপুরি ক্লাস কার্যক্রম হয়তো শুরু করা যাবে না। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ক্লাসের কার্যক্রম করতে হবে।

দেশে গত ৮ মা'র্চ প্রথম করো'না রোগী শনাক্ত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ঝুঁ'কির কথা বিবেচনা করে ১৭ মা'র্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। ছুটি বেড়েছে কয়েকদফায়। শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করেছে। এরপরও বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই পড়ালেখার বাইরে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে নেওয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

তিনি বলেছেন, ‘আগামী বছর যাদের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা, তাদের জন্য ‘তিন মাসে শেষ করা যায়’- এমন একটি সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়েছে, তার আলোকে তাদের তিন মাস ক্লাস করিয়ে তাদের পরীক্ষা নেওয়া হবে।’ দীপু মনি আরো বলেন, ‘সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের আলোকে আম'রা তাদের তিন মাস ক্লাস করাতে চাই। সে কারণে হয়ত এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ২/১ মাস পিছিয়ে যাবে।’

অ'ভিভাবকদেরদা’বি, শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো লেখাপড়া করিয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, নয়তো এসব শিক্ষার্থীর দক্ষতা অর্জনে ঘাটতি থাকবে। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষায় গিয়ে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

বেশ কয়েক বছর ধরে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এসএসসি এবং ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়ে আসছে। ওই দিনগুলো সরকারি ছুটি থাকলে পরের দিন থেকে এসব পরীক্ষা শুরু হয়। এবার এসএসসি পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে নেওয়া গেলেও দেশে করো'না ভাইসের প্রকোপ বাড়তে শুরু করলে গত ১৭ মা'র্চ থেকে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা আ'ট'কে যায়।

বছরের শেষভাগে এসে জানানো হয়, এবার মহামা'ররি মধ্যে আর এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে না। পরীক্ষার্থীদের অষ্টমের সমাপনী এবং এসএসসি ও সমমানের ফলফলের ভিত্তিতে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল ঘোষণা করা হবে।

মহামা'রি পরিস্থিতির ততটা উন্নতি না হওয়ায় পঞ্চ'ম ও অষ্টমের সমাপনী পরীক্ষা এবং স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাও এবার হচ্ছে না। পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষার্থীরা সবাই পরের ক্লাসে উঠে যাবে। তবে শিক্ষার্থীদের কোথায় দুর্বলতা তা বোঝার জন্য ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ছাত্র-ছা'ত্রীদের সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে সাপ্তাহিক অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কওমি মাদ্রাসা বাদে অন্যসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগামী ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা আছে।

এদিকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সম্প্রতি একটি রূপরেখা তৈরি করেছে। ২০২২ সাল থেকে এই রূপরেখার আলোকে কারিকুলাম ও পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন পর্যায়ক্রমে শুরু হবে। এতে বলা হয়েছে- প্রথম পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে দশম শ্রেণিতে। শুধু দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির আলোকেই এই পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

দশম শ্রেণিতে কোনো বিভাগ থাকবে না। সবাইকে ১০টি বিষয় পড়তে হবে। এর মধ্যে পাঁচটি বিষয় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞানে ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও ৫০ শতাংশ পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন হবে। এছাড়া বাকি পাঁচটি বিষয়—জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযু'ক্তি, ভালো থাকা, ধ'র্ম শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতিতে পুরোটাই ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে। ২০২৫ সালে এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে নবম ও দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচি মিলিয়ে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

আর একাদশ শ্রেণি শেষে ও দ্বাদশ শ্রেণি শেষে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তবে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির সম্মিলিত ফলের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে। বর্তমানে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি শেষে একটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই স্তরে ৩০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও ৭০ শতাংশ পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন হবে। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শতভাগ ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে। এসব শ্রেণিতে কোন বার্ষিক পরীক্ষা হবে না। প্রাক প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২০২২ সালে এবং ২০২৩ সাল থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হবে।

চতুর্থ ও পঞ্চ'ম শ্রেণিতে ৭০ শতাংশ নম্বরের ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং বার্ষিক পরীক্ষা হবে ৩০ শতাংশ নম্বরের। এই পরীক্ষা পদ্ধতি চালু হবে চতুর্থ শ্রেণিতে ২০২৪ এবং পঞ্চ'ম শ্রেণিতে ২০২৫ সালে। এছাড়া ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ৬০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং ৪০ শতাংশ বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন হবে। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে ২০২২ সালে এবং ৮ম শ্রেণিতে ২০২৩ সালে এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তবে এই রূপরেখায় পঞ্চ'ম শ্রেণি শেষে পিইসি ও অষ্টম শ্রেণি শেষে জেএসসি পরীক্ষার কথা উল্লেখ নেই।

এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য (কারিকুলাম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতিতে এ দুটি পরীক্ষার কথা উল্লেখ নেই। সরকার এটা নির্বাহী আদেশে নিয়ে থাকে। যদি সরকার চায় তাহলে পরীক্ষা নিতে পারবে। তবে মূল্যায়নের কাঠামো এই রূপরেখা অনুযায়ী হবে। সরকার নির্বাহী আদেশে পিইসি পরীক্ষা নিতে চাইলে ৭০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং ৩০ শতাংশ পরীক্ষার মাধ্যমে নিতে হবে। তারপরই চূড়ান্ত ফল হবে।

পরীক্ষা পদ্ধতির বিষয়ে রূপরেখায় বলা হয়েছে, শিক্ষাক্রমে যোগ্যতাকে জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি, গুণাবলি ও মূল্যবোধের সমন্বয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি বিশেষত পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষার্থীর মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ মূল্যায়ন করে। তাই প্রচলিত পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতি বহাল রেখে শিক্ষাক্রমের মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ শিক্ষার্থীর জ্ঞানের পাশাপাশি দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি, গুণাবলি ও মূল্যবোধ অর্জন সম্ভব হবে না। তাই পাবলিক পরীক্ষায় সামষ্টিক মূল্যায়নের পাশাপাশি শিখনকালীন মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এনসিটিবির কর্মক'র্তারা বলছেন, নতুন শিক্ষাক্রম রূপরেখায় মূল্যায়নকে কেবল শিক্ষার্থীর শিখন মূল্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন, শিখন পরিবেশের মূল্যায়ন ও সে সঙ্গে শিখনের মূল্যায়নের ওপর জো'র দেওয়া হয়েছে। লটারিতে ভর্তি দেশে করো'না সংক্রমণের কারণে স্কুলের সব শ্রেণিতে পরীক্ষার বদলে লটারির মাধ্যমে ভর্তি করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

শিক্ষামন্ত্রী আজ বলেছেন, ‘আমাদের সামনে তিনটি বিকল্প ছিল। এক, শিক্ষার্থীদের স্কুলে এনে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া কিন্তু করো'না ভাই'রাস সংক্রমণ বাড়ছে, এমন পরিস্থিতিতে সেই ঝুঁ'কি আম'রা নিতে চাই না। অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষার একটি অ'পশন ছিল কিন্তু অনেকের অনলাইন ব্যবহারের সুবিধা বা সুযোগ নেই বলে সেটিও গ্রহণ করেনি মন্ত্রণালয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রতি বছর প্রথম শ্রেণীতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি করা হয়ে থাকে। তবে এবার আম'রা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সব শ্রেণীতেই পরীক্ষার বদলে লটারির মাধ্যমে ভর্তি করা হবে। জানুয়ারির মাসের ১০ থেকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এই লটারির মাধ্যমে ভর্তির আয়োজন সম্পন্ন করা হবে।’ ডা. দীপু মনি বলেন, ‘বাংলা ও ইংরেজি, সব মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। আবেদনের পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনের মাধ্যমে হবে। ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রক্রিয়াটির বিস্তারিত জানানো হবে।’

শিক্ষামন্ত্রী জানান, ঢাকা মহানগরীতে স্থানীয় কোটায় শিক্ষার্থী ভর্তির (ক্যাচ'মেন্ট কোটা) সুযোগ আগের ৪০ শতাংশের বদলে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে একেকজন শিক্ষার্থী একেক ক্লাস্টারে পছন্দক্রম হিসাবে পাঁচটি স্কুলের তালিকা দিতে পারবেন। এতদিন শিক্ষার্থীরা একটি স্কুল পছন্দ করতে পারতেন।বাড়তি ফি আদায় করা হলে ব্যবস্থা

শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, কোন স্কুল বাড়তি কোন অর্থ আদায় করতে পারবে না। অনেক সময় অ'ভিভাবকরা এরকম ঘটনার শিকার হলেও অ'ভিযোগ করতে চান না। আমি আশা করবো কেউ এরকম অ'নৈতিক টাকা নেবেন না। ভর্তির ক্ষেত্রে যেমন বাড়তি ফি নেয়া যাবে না, একই স্কুলের শিক্ষার্থী যারা নতুন ক্লাসে উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাদের কাছ থেকেও কোন ফি আদায় করা যাবে না। তারপরেওআম'রা যদি প্রমাণ পাই, তাহলে আম'রা যথাযথ ব্যবস্থা নেব, যোগ করেন মন্ত্রী।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এর আগে এক বি'জ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শুধু টিউশন ফি গ্রহণ করবে। চলতি বছরের ১৮ মা'র্চের পর থেকে নেয়া অন্য সব ফি হয় ফেরত দিতে হবে বা টিউশন ফির সাথে সমন্বয় করতে হবে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে। বি'জ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অ্যাসাইনমেন্ট, টিফিন, পুনঃ ভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন ও উন্নয়ন বাবদ কোনো ফি গ্রহণ করবে না প্রতিষ্ঠান।

Back to top button