বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি

রাজধানীর রায়েরবাজার বস্তিতে থাকেন মিতালি বেগম (৪৫)। তার সঙ্গে থাকেন দুই মে'য়ে লিলি ও পলি। স্বামী না থাকায় মিতালির সংসার চলে বিভিন্ন বাসায় বুয়ার কাজ করে।

তবে এবার নির্দিষ্ট বেতন ছাড়াও একটি বাসা থেকে অ'তিরিক্ত পাঁচহাজার টাকা চেয়েছেন তিনি। এই টাকা দিয়ে মে'য়ের জন্য ভিডিও কলে কথা বলা যায় এমন একটি মোবাইল ফোন কিনবেন মিতালি।

ফোন কেনার বিষয়ে তিনি বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ‘মোবাইলের অভাবে মে'য়েটা কলেজের ক্লাস অনলাইনে করতে পারছে না। এ জীবনে কিছুই পাইনি তাই দুই মে'য়েকে নিয়েই স্বপ্ন দেখি।’

শনিবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যরা। উপাচার্যদের সংগঠন ‘বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের’ ভা'র্চুয়াল এক সভায় এ প্রস্তাব আসলে তাতে উপাচার্যরা সম্মত হন।

তবে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে মিতালি বেগমের মতো অনেকের স্বপ্ন দুঃস্বপে রূপান্তরিত হতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষাবিদ যতিন সরকার বলেন, ‘এখনো বাংলাদেশের ৭৫ ভাগ মানুষ গ্রামে থাকেন। করো'না পরিস্থিতির কারণে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। এছাড়া অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার কথা বলা হচ্ছে। অথচ এ বিষয়ে পরীক্ষার্থী বা পরীক্ষক কারও কোনো ধারণা নেই।’

দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনলাইনে অনুষ্ঠিত হবে এমন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অথচ সারাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ ভাগ শিক্ষার্থী এখনো স্মা'র্ট ফোন ব্যবহার করে না।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালক ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ‘কোন পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনুস্ঠিত হবে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। সার্বিক বিষয় চিন্তাভাবনা করেই পরীক্ষা নেয়া হবে।’

তবে কী' সিদ্ধান্ত নেয়া হবে এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অ'ভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা সংশয়। এ ব্যাপারে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক অ'ভিভাবক বলেন, ‘এইচএসসি পরীক্ষা হবে কী' হবে না এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনেক মানসিক চাপ নিতে হয়েছে। ঠিক তেমনি ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কিভাবে হবে তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।’

‘তবে সিদ্ধান্ত যেটাই হোক সরকার যেন তা গ্রহণ করে দ্রুত বাস্তবায়ন করে’ এমন দাবিও জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার্থী মামুনুর রহমান বলেন, ‘এতো বেশি পরিমাণ সিকিউরিটি দেয়ার পরেও যেই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি চলে, দু'র্নীতি চলে, সিট বাণিজ্য চলে সেই পরীক্ষা অনলাইনে নেয়া কতটা নিরাপদ হবে আমা'র মা'থায় আসে না।’

‘আশা করি, এমন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে। না হলে এবার মধ্যবিত্ত আর গরীব শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াটা স্বপ্নই থেকে যাবে’ যোগ করেন তিনি।

ফারিয়া তাবাসসুম এশা নামে অ'পর এক পরীক্ষার্থী মনে করেন, এভাবে মেধাবীদের মূল্যায়ন কোনোভাবেই সম্ভব না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিতে চান তিনি।

এ বিষয়ে শিরিন পারভিন নামে এক অ'ভিভাবক বাংলাদেশ জার্নালকে জানান, দেশে অনলাইন পদ্ধতি এখনো প্রচলিতভাবে কার্যকরী হয়নি। অনলাইনে পরীক্ষা নেয়ার বিপক্ষে আমি। প্রয়োজনে পরীক্ষার সময় আরো পেছানো যেতে পারে। নয়তো সঠিক মূল্যায়ন কখনোই হবে না। এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য দাবিও জানান তিনি।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের সভাপতি ড. মোহাম্ম'দ রফিকুল আলম বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনলাইনেও হতে পারে আবার অফলাইনেও হতে পারে। যেহেতু ডিসেম্বরের শেষে এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দেয়া হবে। তাই আমাদের হাতে এখনো চার মাস সময় আছে।’

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভা'র্সিটির (বিডিইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূরের নেতৃত্বে তৈরি করা একটি মোবাইল বেসড সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রস্তাব এসেছে। অনেক উপাচার্য এ প্রস্তাবকে উপযোগী মনে করছেন’ জানিয়ে অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ বলেন, ‘সিম্পল কনসেপ্টে সফটওয়্যারটি তৈরি করা হয়েছে। এখানে অংশ নেয়া পরীক্ষার্থীদের কোনো অনিয়মের আশ্রয়ের সুযোগ থাকবে না।’

‘তবে সব শিক্ষার্থী ইন্টারনেটের আওতায় আসেনি’ স্বীকার করে তিনি আরো বলেন, ‘এখনো অনেকেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকেন। কিন্তু দেশ ও বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হবে। এর মধ্য দিয়ে আমাদের এগিয়েও যেতে হবে, অবশ্যই শিক্ষার্থীদের চিন্তা মা'থায় রেখে।’

প্রসঙ্গত, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জেএসসি, এসএসসি এবং সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ফল মূল্যায়ন করা হবে। এই পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ১৩ লাখ ৬৫ হাজারেরও বেশি। সরাসরি পরীক্ষা না হওয়ায় তারা সবাই এবার উত্তীর্ণ হবেন।

Back to top button