দিনমজুর রিকশাচালক এখন বিরাট ধনী

একসময়ের রিকশা আর ঠেলাগাড়িচালক এখন চলেন ৫০ লাখ টাকার গাড়িতে। আরেকজন অভাবের তাড়নায় করেছেন দিনমজুরের কাজ, থাকতেন খুপরি ঘরে। আজ তিনি থাকেন বিশাল অট্টালিকায়। অন্য একজন,যাঁর ছিল না এক টুকরা ভিটেমাটি, তিনি হয়েছেন কয়েক শ বিঘা জমির মালিক।

আন্যদিকে সন্তানদের মুখে যিনি খাবার জোটাতে সুপারি বিক্রি আর অন্যের বাড়িতে কামলা দিতেন, তিনি এখন কয়েকটি শুল্ক স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করেন। শতাধিক শ্রমিক কাজ করেন তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।এমন আশ্চর্যজনক ভাগ্যবদল ঘটেছে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জে'লার অর্ধশত কয়লা ও পাথর ব্যবসায়ীর। এই দুটি জে'লার সীমান্তের ১৩টি শুল্ক স্টেশনের মাধ্যমে ভা'রত থেকে কয়লা-পাথর আম'দানির সুযোগে তাঁরা করে চলেছেন বিরাট কারসাজি।

ব্যাংকের এলসির চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে কয়লা শুল্ক না দিয়ে আম'দানি করে একেকজন সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মক'র্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে আঁতাত করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে তাঁরা সরকারকে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করে চলেছেন।তাঁদের একজন সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজে'লার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের বড়ছড়া গ্রামের মৃ'ত মফিজউদ্দিন মোল্লার ছে'লে আলখাছ উদ্দিন খন্দকার। ‘খন্দকার অ্যান্ড ব্রাদার্সের’ মালিক। একসময়ের দিনমজুর আলখাছ উদ্দিন তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জ শহরে

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজে'লা থেকে মামা ছায়েদ আলীর হাত ধরেই ১৯৭৫ সালের পর তাহিরপুরের বড়ছড়ায় আসেন আলখাছ ও তাঁর ভাইয়েরা। সেখানের বিসিএসআইআরের অধীনে চুনাপাথরখনিতে দিনমজুর হিসেবে তিন ভাই কাজ বড়ছড়া সীমান্ত দিয়ে কয়লা আর পাথর আম'দানি শুরু হলে অল্প অল্প করে এই আমাদানিতে নামেন। ১০০ টন আনার এলসি করে শত শত টন আনা শুরু করেন শুল্ক না দিয়ে। আলখাছ ও তাঁর দুই ভাই রিয়াজ উদ্দিন খন্দকার ও গিয়াস উদ্দিন খন্দকার লিটন দুই দশকের ব্যবধানে কয়েক শ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।

তাঁরা চড়েন প্রাডো গাড়িতে। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁরা পাথর ও কয়লা ব্যবসায় একচেটিয়া রাজত্ব কায়েম করেন।২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও একটুও কমেনি আলখাছ সিন্ডিকে'টের দাপট। ডিগবাজি দিয়ে আলখাছ এখন আওয়ামী লীগ নেতা। বাগিয়ে নিয়েছেন তাহিরপুর উপজে'লা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও। টাকার জো'রে ছে'লে মঞ্জুর খন্দকারের জন্য জে'লা যুবলীগের পদও বাগিয়ে নিয়েছেন।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুল্ক ফাঁকির বদৌলতে আলখাছ তাহিরপুরের বড়ছড়া শুল্ক স্টেশনের পাশেই কিনেছেন ৩০ বিঘা জমি, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা। বড়ছড়ায় ৩০ শতাংশ জমির ওপর নির্মাণ করেছেন দোতলা বাড়ি, সুনামগঞ্জ শহরের নবীনগরে পাঁচ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে খন্দকার হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শহরের আলীপাড়ায় তিন একর জমির ওপর বিলাসবহুল অট্টালিকা এবং ম'সজিদ, পুকুর ও খেলার মাঠ রয়েছে এর সঙ্গে। এই বাড়ি ও জমির মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা।

আর শহরের মধ্যপাড়ায় আছে খন্দকার মা'র্কেট, যার আনুমানিক মূল্য ১১ কোটি টাকা। সুনামগঞ্জ শহর ও তাহিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে আলখাছের রয়েছে কয়েক শ কোটি টাকার সম্পদ।তাহিরপুর উপজে'লার আলকাছই শুধু নন, কয়লা আম'দানির শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অর্ধশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন মোবারক এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুস সামাদ ওরফে সামাদ মুন্সি। একসময় সিলেট শহরের মাঝেরটিলা এলাকায় রিকশা চালাতেন তিনি। তাহিরপুর ও সুনামগঞ্জ শহরে কিনেছেন জমি, বাড়ি ও মা'র্কেট। সামাদ মুন্সি কিছুদিন মাদরাসায় পড়ালেখা করেছেন। তার সহপাঠী ছিলেন চারাগাঁও গ্রামের আব্দুস সাত্তার।

কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘খুবই ক'ষ্ট করত ওরা। কয়লা ব্যবসা করেই এখন কোটি টাকার মালিক।’ময়মনসিংহ থেকে তাহিরপুরে এসে দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন বর্তমানে স্বর্ণা এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল কুদ্দুস মিয়া ওরফে বেল কুদ্দুস। তিনি তাহিরপুর উপজে'লায় বাড়ি করেছেন, বাদাঘাট বাজারে ১৫ শতাংশ জমির ওপর মা'র্কেট এবং সুনামগঞ্জ ও সিলেটে কিনেছেন অর্ধশত কোটি টাকার জমি। আর বড়ছড়া গ্রামের কয়লা ব্যবসায়ী এরশাদ মিয়া চালাতেন ঠেলাগাড়ি। ১০ বছরের ব্যবধানে তিনি প্রায় ১০ কোটি টাকার মালিক।

এম'রান এন্টারপ্রাইজের মালিক তারা মিয়া মাঠে-ঘাটে শ্রমিকের কাজ করলেও কয়লা ব্যবসা করে বিরাট ধনী। নিজের নিরাপত্তার জন্য ব'ন্দুক নিয়ে চলাফেলা করেন। এভাবে কয়লা আম'দানির ফাঁকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে, সরকারকে ঠকিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন তাহিরপুরের মোশাররফ অ্যান্ড সন্সের মালিক মোশাররফ হোসেন, বাগলী চুনাপাথর ও কয়লা আম'দানিকারক সমিতির সভাপতি আব্দুল খালেক ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, মোস্তাক অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক মোস্তাক আহমেদ, আতাউর এন্টারপ্রাইজের মালিক খসরুল আলম, খাজা ভাণ্ডারের মালিক স্বপন, রিপন ট্রেডার্সের মালিক মনমোহন পাল মতিশসহ তাহিরপুর উপজে'লার প্রায় অর্ধশত কয়লা ও পাথর ব্যবসায়ী।

তাহিরপুর উপজে'লার ষাটোর্ধ্ব ঈসমাইল হোসেনের সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ করলে তিনি বলেন, ‘বিএনপি আমলে এমন সময় গেছে যে ১০০ টন এলসি করে এক হাজার টন মাল দেশে নিয়ে এসেছে। এখন ১০০ টন এলসি করলে ২০০ টন নিয়ে আসে। আর এভাবেই শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কয়লা ব্যবসায়ীদের অনেকেই বাড়ি-গাড়িসহ প্রচুর সম্পদের মালিক বনে গেছেন।’তাহিরপুর উপজে'লার একাধিক আম'দানিকারক ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জানান, তাঁরা ১০ বছর ধরে শতভাগ শুল্ক দিয়ে কয়লার ব্যবসা করেও খুব বেশি উন্নতি করতে পারেননি। আর কিছু লোকের দিন যাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সম্পদ বাড়ছেই। শুল্ক স্টেশনের কর্মক'র্তাদের সঙ্গে আঁতাত করেই শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কয়লা আর পাথর আম'দানি করে তাঁরা সম্পদের পাহাড় গড়ে চলেছেন।

তাহিরপুর উপজে'লা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জ'ড়িত আলখাছ উদ্দিন খন্দকার এখন টাকার জো'রে আওয়ামী লীগ নেতা হয়েছেন। বড়ছড়া স্টেশন তাঁদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে। একসময় দিনমজুরি করতেন, এখন তিনি কয়েক শ কোটি টাকার মালিক। যুবলীগের সাবেক একজন কেন্দ্রীয় নেতাকে ম্যানেজ করে তাঁর ছে'লেকে যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়কও বানিয়েছেন তিনি। আর আম'রা যারা প্রকৃত আওয়ামী লীগার, তারা খুবই ক'ষ্টে আছি।’

Back to top button