হলি আর্টিজান হা'মলার ৪ বছর : কী' ঘটেছিল সে রাতে

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে নৃ'শংস জ'ঙ্গি হা'মলার চার বছর পূর্তি আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই দিনটি ছিল শুক্রবার। ওই দিন রাত ৮টার পর হঠাৎ করে খবর পাওয়া যায়, গুলশানে ‘স'ন্ত্রাসীদের সঙ্গে’ পু'লিশের গো'লাগু'লি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানা গেল, এক রেস্তোরাঁয় সশস্ত্র হা'মলাকারী ঢুকে বেশ কয়েকজনকে জি'ম্মিও করেছে। কিন্তু ঘটনাটা আসলে কি গুজব নাকি সত্য, সেটি নিশ্চিত হতেই ঘণ্টাখানেক সময় চলে গেল। পরে জানা গেল, হা'মলাকারীরা ওই রেস্টুরেন্টে থাকা বিদেশি নাগরিকসহ বেশ কয়েকজনকে জি'ম্মি করেছে।

একপর্যায়ে জানা যায়, রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে গুলশান ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারিতে জ'ঙ্গিরা হা'মলা চালিয়েছে।

জি'ম্মি সংকটের ঘটনায় ১ জুলাই সন্ধ্যারাত থেকে দিবাগত রাত, অর্থাৎ ২ জুলাই সারা বিশ্বের গণমাধ্যমের নজর ছিল ঢাকার অ'ভিজাত গুলশান এলাকার হলি আর্টিজান বেকারির দিকে।

সেদিনের জ'ঙ্গি হা'মলায় দুই পু'লিশ কর্মক'র্তা ও ১৭ বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২২ জন নি'হত হন। কয়েকবার প্রস্তুতি নিয়েও রাতে অ'ভিযান চালায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরদিন সকালে সে'নাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো সদস্যদের পরিচালিত ‘অ'পারেশন থান্ডারবোল্টে’ অবসান হয় জি'ম্মিদশার। পু'লিশের অ'ভিযানে মৃ'ত্যু হয় হা'মলাকারী পাঁচ জ'ঙ্গির।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি ওই দিনের ঘটনাক্রম সময় অনুযায়ী তুলে ধরেছে এভাবে:

রাত ৯টা ৫ মিনিট : গুলশান ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারিতে জ'ঙ্গিদের হা'মলার খবর পায় পু'লিশ। গুলশানের পু'লিশের সহকারী কমিশনার আশরাফুল করিম জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুলশান থা'না পু'লিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।

রাত ৯টা ২০ মিনিটে ঘটনাস্থলে গো'লাগু'লির শব্দ শুনতে পান প্রত্যক্ষদর্শীরা। ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী' রুবানা হক এ সময় টুইট করেন, ‘পু'লিশ ইজ সারাউন্ডিং দি এরিয়া, গানফায়ার স্টিল অন’ (পু'লিশ ঘটনাস্থল ঘিরে রয়েছে, এখনো গো'লাগু'লি চলছে)।

রাত সাড়ে ৯টার দিকে গু'লিতে আ'হত হন বনানী থা'নার ভা'রপ্রাপ্ত কর্মক'র্তা (ওসি) মোহাম্ম'দ সালাউদ্দীন। হাসপাতা'লে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে।

রাত ১০টার দিকে পু'লিশ, রেব এবং আধা সাম'রিক বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কয়েকশ সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেযন।

গণমাধ্যমকর্মীরাও ৭৯ নম্বর রোডের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান নেন।

রাত সোয়া ১১টার দিকে হাসপাতা'লে মা'রা যান বনানী থা'নার ওসি মোহাম্ম'দ সালাউদ্দীন। এর কিছুক্ষণ পরই ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) মো. রবিউল করিম নি'হত হন।

এদিকে, গুলশানে হা'মলার পর ইস'লামিক স্টেট জ'ঙ্গিগোষ্ঠী (আই'এস) তাদের বার্তা সংস্থা ‘আমাক’-এ পাঁচ হা'মলাকারীর ছবি প্রকাশ করে।

শনিবার (১ জুলাই) ভোররাত ৪টা পর্যন্ত অ'স্ত্রধারীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

আই'এসের দায় স্বীকার

রাতেই ইস'লামিক স্টেট জ'ঙ্গিগোষ্ঠী তাদের বার্তা সংস্থা বলে পরিচিত ‘আমাক’-এ গুলশান হা'মলার দায় স্বীকার করে ২০ জন নি'হত হওয়ার কথা জানায়।

আই'এসের পক্ষ থেকে হা'মলাকারীদের মধ্যে পাঁচজনকে তাদের ‘সৈনিক’ বলে দাবি করে, হা'মলার দায় নেয় তারা।

২ জুলাই অ'ভিযানের ঘটনাক্রম

সকাল ৭টা ৩০ মিনিট : রাতভর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিসংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখার পর সে'নাবাহিনী, নৌবাহিনী, পু'লিশ, রেব ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ কমান্ডো দল গুলশানে অ'ভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়।

৭টা ৪৫ মিনিট : কমান্ডো বাহিনী অ'ভিযান শুরু করে। অ'স্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দলের সদস্যরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় গো'লাগু'লির শব্দ শোনা যায়।

সকাল সোয়া ৮টায় রেস্টুরেন্ট থেকে প্রথম দফায় নারী ও শি'শুসহ ছয়জনকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। পাশের একটি ভবন থেকে একজন বিদেশি নাগরিক তাঁর মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন।

৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় অ'ভিযানকারীরা। গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতর বি'স্ফো'রকের জন্য তল্লা'শি শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করেন গোয়েন্দারা।

৯টা ১৫ মিনিটে অ'ভিযান শেষ হয়। কমান্ডো অ'ভিযানের মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার র'ক্তাক্ত জি'ম্মি সংকটের অবসান হয়।

সকাল ১০টায় চার বিদেশিসহ ১৩ জন জীবিত উ'দ্ধারের খবর জানানো হয়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে অ'জ্ঞাতপরিচয় পাঁচজনের মৃ'তদেহ পাওয়ার কথা পু'লিশ জানায়।

১১টা ৫০ মিনিট : অ'ভিযানে জ'ঙ্গিদের ছয়জন নি'হত এবং একজন ধ'রা পড়েছে বলে নিশ্চিত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গুলশানে প্রায় ১২ ঘণ্টার র'ক্তাক্ত জি'ম্মি সংকটের অবসান ঘটে সকালে এক কমান্ডো অ'ভিযানের মাধ্যমে।

দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আই'এসপিআর থেকে এক সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়, রেস্টুরেন্ট থেকে ২০টি মৃ'তদেহ উ'দ্ধার করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী খবরের শিরোনাম

বাংলাদেশের মানুষ প্রথমবারের মতো এ ধরনের নৃ'শংস হা'মলা দেখে। খবরের শিরোনাম হয় বিশ্বব্যাপী।

দেশি, বিদেশি ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে খবরের প্রধান শিরোনাম, আলোচনার বিষয় হয় গুলশান হা'মলার ঘটনা। দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে পরবর্তী কয়েক দিন খবর ছিল বাংলাদেশের গুলশানে ক্যাফেতে হা'মলার ঘটনা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ'ভিযান

গুলশান হা'মলা বাংলাদেশের ইতিহাসে জ'ঙ্গি হা'মলার ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। যার সঙ্গে সম্ভবত দেশের কেউ পরিচিত ছিল না। বাংলাদেশ সরকারও জ'ঙ্গি নির্মূলে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। ভাড়াটিয়াদের স'ম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ, নি'খোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা করা এবং জ'ঙ্গি স'ন্দেহে দেশের বিভিন্ন স্থানে অ'ভিযান পরিচালনা শুরু হয়।

হলি আর্টিজানে হা'মলার ঘটনা পু'লিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট'কে আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকেও ঢেলে সাজানো হয় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করে আসছে।

ঢাকাসহ সারা দেশে জ'ঙ্গিদের মোকাবিলায় ব্যাপক অ'ভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পু'লিশের হিসাব অনুযায়ী, হা'মলা-পরবর্তী তিন বছরে অব্যাহত জ'ঙ্গিবিরোধী অ'ভিযানে ৮০ জন নি'হত ও তিনশর বেশি গ্রে'প্তার হয়।

গুলশান হা'মলার চার্জশিট

দুই বছর পর আটজনকে অ'ভিযু'ক্ত করে আ'দালতে চার্জশিট দাখিল করেছে পু'লিশ।

মা'মলার ত'দন্তে ঘটনার সঙ্গে মোট ২১ জন জড়িত ছিল বলে তথ্য পেয়েছে পু'লিশ এবং এর মধ্যে ঘটনার দিন ও পরে ১৩ জন বিভিন্ন অ'ভিযানে নি'হত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পু'লিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইস'লাম।

তবে এতে হা'মলার ঘটনার পর আ'ট'ক হওয়া ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আ'দালতে চার্জশিট দাখিলের পর ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইস'লাম। তিনি জানান, ওই ঘটনায় মোট ২১ জনের মধ্যে পাঁচজন ঘটনাস্থলেই নি'হত হয়েছিলেন। পরে বিভিন্ন অ'ভিযানে নি'হত হয়েছে আরো আটজন। তাই চার্জশিটে আটজনকে অ'ভিযু'ক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন রাকিবুল হাসান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, রাশেদুল ইস'লাম, সোহেল মাহফুজ, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, হাদিসুর রহমান সাগর, মামুনুর রশীদ রিপন ও শরীফুল ইস'লাম খালেদ। অন্য অ'ভিযানে নি'হত আটজন হলেন তামিম চৌধুরী, মা'রজান, সারোয়ার জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান, তানভীর কাদেরী, তারেক রায়হান ও ছোট রায়হান।

হলি আর্টিজানে যাঁরা নি'হত : রোহান ইমতিয়াজ, খায়রুল ইস'লাম পায়েল, সামিউল মোবাশ্বির, শফিকুল ইস'লাম উজ্জ্বল ও নিবরাস ইস'লাম।

দুই বছরের বেশি সময় ধরে ত'দন্তের পর ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই এ মা'মলার অ'ভিযোগপত্র আ'দালতে জমা দেয় ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রা'ইম (সিটিটিসি) ইউনিট। বিচারিক কার্যক্রম শুরুর এক বছরের মধ্যেই গত ২৭ নভেম্বর আ'লোচিত এ মা'মলার রায় ঘোষণা করেন আ'দালত।

রায়ে মা'মলার আট আ'সামির সাতজনকে মৃ'ত্যুদ'ণ্ড ও একজনকে বেকসুর খালাস দেন আ'দালত। মৃ'ত্যুদ'ণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আ'সামিকে ৫০ হাজার টাকা করে জ'রিমানাও করা হয়।

দ'ণ্ডপ্রাপ্ত আ'সামিরা হলেন জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আবদুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইস'লাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ রিপন। এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে জ'ড়িত থাকার বিষয়ে স'ন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে বেকসুর খালাস দেন আ'দালত।

সিটিটিসির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, প্রায় দেড় বছর আগে পরিকল্পনা এবং দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে নৃ'শংস এ হা'মলা সরাসরি বাস্তবায়নে দায়িত্ব দেওয়া হয় আত্মঘাতী পাঁচ জ'ঙ্গিকে। আন্তর্জাতিক জ'ঙ্গিগোষ্ঠী আই'এসের ভাবধারায় অনুপ্রা'ণিত হয়ে জেএমবির একটি গ্রুপ বিদেশিদের ওপর হা'মলার সিদ্ধান্ত নেয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। পরে ‘নব্য জেএমবি’ নামে পরিচিতি পাওয়া এ গ্রুপটির কথিত শূরা কমিটি গাইবান্ধার সাঘাটায় বৈঠক করে এ সিদ্ধান্ত নেয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আ'দালত বলেন, বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদ কায়েমের লক্ষ্যে জননিরাপত্তা বিপন্ন করার এবং আন্তর্জাতিক জ'ঙ্গি সংগঠন আই'এসের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য জেএমবির একাংশ নিয়ে গঠিত নব্য জেএমবির সদস্যরা গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকী'য় ও দানবীয় হ'ত্যাকা'ণ্ড ঘটিয়েছে। হলি আর্টিজান হা'মলার মধ্য দিয়ে জ'ঙ্গিবাদের উন্মত্ততা, নিষ্ঠুরতা ও নৃ'শংসতার জঘন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। নিরপরাধ দেশি-বিদেশি মানুষ যখন রাতের খাবার খেতে হলি আর্টিজান বেকারিতে যায়, তখনই আকস্মিকভাবে তাদের ওপর নেমে আসে জ'ঙ্গিবাদের ভ'য়াল রূপ। জ'ঙ্গি স'ন্ত্রাসীরা শি'শুদের সামনে এ হ'ত্যাকা'ণ্ড চালায়। মৃ'ত্যু নিশ্চিত করার জন্য জ'ঙ্গিরা নিথর দেহগুলোকে ধারালো অ'স্ত্র দিয়ে কো'পায়। মুহূর্তের মধ্যে মৃ'ত্যুপুরীতে পরিণত হয় হলি আর্টিজান বেকারি।

Back to top button