‘আমিও তো সঙ্গেই ছিলাম মুক্তা, মাকে নিয়ে তুই চলে গেলি বোন!’

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে তার মা ও বোনকে একসাথে হারিয়েছেন মুন্সিগঞ্জের যুবক সাইফুল ইস'লাম রিফাত (২৬)। কিছুদিন আগে পরিবার রেখে মালয়শিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন রিফাতের বাবা। এদিকে মা ও বোনকে নিয়ে রিফাত থাকে পুরান ঢাকায়। গতকাল সোমবার (৩০ জুন) বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে সেই প্রা'ণপ্রিয় মা ও ছোট বোনকে হারিয়েছে রিফাত। মা ও বোনকে হা'রানোর শোকে পাগলপ্রায় রিফাত। গতকাল স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ম'র্গ চত্বরে বসে আর্তনাদ করে রিফাত বলছিলেন, ‘মুক্তা, আমিও তো তোদের সঙ্গেই ছিলাম। মাকে নিয়ে তুই চলে গেলি বোন! তোকে আমি কত ভালোবাসি জানিস না! পানির মধ্যে আমি অনেক খুঁজেছি তোকে, মাকে। পাইনি। চোখের নিমেষেই তোরা ডুবে মা'রা গেলি, আমি কেন বেঁচে ফিরলাম!’

রিফাত পুরান ঢাকার চকবাজারে একটি অনলাইন শপিংয়ে ডেলিভা'রিম্যান হিসেবে চাকরি করেন। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের মিল্ক্কিপাড়ায়। কর্মস্থল থেকে তিন দিন ছুটি নিয়ে সর্বশেষ গত শুক্রবার গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন রিফাত। সঙ্গে ছিলেন মা ও বোন। ছুটি শেষে গতকাল সোমবার চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল রিফাতের। তাই সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে মুন্সীগঞ্জ কাঠপট্টি থেকে ‘ম'র্নিং বার্ড’ লঞ্চে ওঠেন মা ও বোনকে নিয়ে। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু ইরফান। মাঝপথে এসে ইরফান দোতলা লঞ্চের ছাদে উঠে যান। মা-বোনের সঙ্গে দোতলায় পাশাপাশি বসেছিলেন রিফাত। সারাপথ বোনের সঙ্গে খু'নসুটি করতে করতে আসেন তিনি। সদরঘাটের কাছাকাছি এসে চোখের নিমেষেই তাদের বহনকারী লঞ্চটি ডুবে যায়। রিফাত ও তার বন্ধু ইরফান ভাগ্যক্রমে জীবন বাঁ'চাতে পেরেছেন। রিফাতের ডান পায়ের হাঁটু কে'টে গেছে ডুবন্ত লঞ্চ থেকে বের হওয়ার সময়।

উ'দ্ধারকারী দল রিফাতকে পুরান ঢাকার একটি হাসপাতা'লে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েই স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ম'র্গে ছুটে যান তিনি। কী'ভাবে বেঁচে গেলেন, সে স'ম্পর্কে রিফাত আহমেদ বলেন, ‘আম'রা তো কল্পনাও করিনি যে সদরঘাটে আমাদের লঞ্চকে অন্য আরেকটা লঞ্চ ধাক্কা দেবে। আমি, আমা'র মা আর বোন লঞ্চের ভেতরে ছিলাম। আর আমা'র বন্ধু ছিল ছাদে। মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে আমাদের লঞ্চ ছাড়ে ৮টার কিছু আগে। লঞ্চের ভেতর আমা'র হালকা ঘুম চলে এসেছিল। তবে সদরঘাটের কাছাকাছি আসায় আম্মু আমাকে জাগিয়ে তোলেন। আম'রা সদরঘাটের একেবারই কাছাকাছি চলে আসি। তখন বড় একটা লঞ্চ আমাদের লঞ্চকে ধাক্কা মা'রে। সঙ্গে সঙ্গে উল্টে যায়। আমি, আমা'র মা আর বোন পানির নিচে তলিয়ে যাই। মা আর বোন পানির নিচে কোথায় হারিয়ে গেল জানি না। পানির নিচে আমা'র দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কয়েক ঢোক পানিও খেয়েছি। কিন্তু কী'ভাবে যেন উপরে ভেসে উঠি। তখন আমা'র জ্ঞান ছিল না। লোকজন ধ'রাধরি করে আমাকে হাসপাতা'লে নিয়ে আসে। আমি বেঁচে যাই।’

এদিকে, মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ছেড়ে আসা ম'র্নিং বার্ড নামের যে লঞ্চটি সদরঘাটে ডুবে গেল, সেটির চালকের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মা-বোন হা'রানো রিফাত আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমি সাক্ষী হতে চাই, যে চালক আজ ম'র্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি চালিয়েছেন, আদৌ তাঁর লঞ্চ চালানোর সনদ আছে কি না? কারণ মুন্সিগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসার পর মাঝপথে লঞ্চটি আরেকটি বালুবাহী জাহাজকে (বাল্কহেড) ধাক্কা দিয়েছিল। ভাগ্যক্রমে তখন কোনো দুর্ঘ'টনা হয়নি। তখন কিন্তু একবার আম'রা ভ'য় পেয়ে যাই। আবার সদরঘাটের কাছাকাছি আসার পর আমাদের লঞ্চের চালক যদি সতর্ক থাকতেন, তাহলে কিন্তু এই দুর্ঘট না-ও ঘটতে পারত। তবে আমাদের লঞ্চটি ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেওয়ার দায় ময়ূর-২ কোনোভাবে এড়াতে পারে না। ময়ূর-২ আমা'র মা-বোনকে মে'রে ফেলল। আমি বিচার চাই। কঠিন শা'স্তি চাই। এই ঘটনায় যাঁদের গ্রে'প্তার করা হবে, তাঁরা যেন জামিন না পান। দ্রুত বিচার করা হোক।’

রিফাত আরও জানান, কোরবানি ঈদের আগে আর গ্রামে ফিরবেন না বলেও কথা হয়েছিল তাদের মধ্যে। ঠিক করেছিলেন, একবারে কোরবানির সময় একসঙ্গে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু মা-বোনকে নিয়ে আর কখনোই গ্রামের বাড়ি ফেরা হবে না রিফাতের। এখন থেকে তাকে একাই যেতে হবে গ্রামে। লঞ্চ দুর্ঘ'টনা স'ম্পর্কে রিফাত জানান, এটি একটি ছোট লঞ্চ। তার ধারণা, ৬০-৭০ জন যাত্রী ছিল। ৯টার দিকে সদরঘাটের কাছাকাছি ফরাশগঞ্জ বরাবর আসে। এ সময় একটি লঞ্চ ব্যাকগিয়ার করে তাদের বহনকারী লঞ্চের পেছনে সজো'রে ধাক্কা মা'রে। চোখের নিমেষেই লঞ্চটি এক ধাক্কায় উল্টে ডুবে যায়। ভেতরে যারা ছিলেন, তাদের অনেকেই কিছু বুঝে উঠতে পারেননি। রিফাত বলেন, ‘ধাক্কা মা'রার সঙ্গে সঙ্গে আমি মা-বোনকে জড়িয়ে ধ'রার চেষ্টা করি। কিন্তু এর আগেই লঞ্চ ডুবে যায়।’

Back to top button